ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দিয়েছিলেন তালেবান প্রধান মোল্লা ওমর। তাও এমন একটা সময়ে যখন পুরো বিশ্বে তার লুকানোর মতো কোনো জায়গা ছিল না।
কথিত আছে আফগানিস্তানে বসেই ওসামা বিন লাদেন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত হানার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, যে ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
‘লুকিং ফর দ্য এনিমি, মোল্লা ওমর অ্যান্ড দ্য আননোন তালিবান’ নামে আফগানিস্তানে লাদেনকে আশ্রয় দানকারী মোল্লা ওমরের জীবনী লিখেছেন ডাচ সাংবাদিক এবং লেখক বেটি ডাম।
বইয়ে তিনি এ উল্লেখ করেছেন, সর্বত্র মোল্লা ওমরের একটা মাত্র ছবিই দেখা যায়। সেটাই যে সঠিক সে বিষয়েও ব্যাপক সমর্থন পাওয়া যায় না। কেউই নিশ্চিত করতে পারেন না যে ছবিটা সত্যিই মোল্লা ওমরের কী না।
২০০১ সালের পর মোল্লা ওমর কোথায় যান, তা নিয়ে রহস্য ছিল। আফগান সরকার, যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির সরকার ও গণমাধ্যম বিশ্বাস করত তিনি পাকিস্তানে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে তালেবান সে সময় ওই দাবি অস্বীকার করে বলেছিল, মোল্লা ওমর আফগানিস্তানেই আছেন। তবে ২০০১ সাল থেকেই বিভিন্ন সময়ে তার মৃত্যুর বিষয়ে খবর ছড়াতে দেখা গেছে।
তাকে ধরতে মরিয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ২০১২ সালে ঘোষণা করে, এই তালেবান নেতার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে পারলে সে ব্যক্তিকে দুই কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় মোল্লা ওমরের বর্ণনা যেভাবে দেওয়া হয়েছিল তা হচ্ছে -
চুল- কালো
উচ্চতা- লম্বা
জাতীয়তা- আফগান
বিশেষ চিহ্ন- ডান চোখে আঘাতের চিহ্ন
সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ
এমন নয় যে শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু ছিলেন তিনি। বরং একটা সময় ছিল যখন তাকে কাজের মানুষ বলেই বিবেচনা করত মার্কিনীরা। এর কারণ হলো, যারা সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল তাদের মধ্যে একজন মোল্লা ওমর।
আফগানিস্তানের কান্দাহারের এক গ্রামে তার জন্ম। মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। যে সময় সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে শুরু করেন, তখন তার বয়স আনুমানিক ২২-২৩ বছর।
ডাচ লেখক বেটি ডাম লিখেছেন, যুদ্ধের সময় তাকে রকেটি বলে ডাকা হতো, কারণ রকেটের বিষয়ে তার নিশানা ছিল অব্যর্থ। শুরুর দিকে কিন্তু আফগান যোদ্ধাদের লক্ষ্য এতটা ভালো ছিল না, যে কারণে বহু নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
মিজ ডামকে তালেবানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ মুতাওয়াক্কিল বলেছিলেন, সোভিয়েত সৈন্যদের নজর কেড়েছিল ওমর। এমনকি একবার তারা (সোভিয়েতের পক্ষ থেকে) রেডিওতে ঘোষণা করেছিলেন যে লম্বা লোকটাকে (মোল্লা ওমর) হত্যা করা হয়েছে। তবে, এটা মনগড়া কথা ছিল। কারণ ওই লম্বা লোকটা (মোল্লা ওমর) ততক্ষণে তাদের হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেডের তালিকায় নাম থাকা মোল্লা ওমরের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে লিখেছেন মিজ ডাম।
তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ছেলেবেলায় ওমরের স্বভাব একটু দুষ্টু প্রকৃতির হলেও পরে তিনি অন্তর্মুখী এবং লাজুক হয়ে ওঠেন, বিশেষত বাইরের মানুষের সামনে। কিন্তু তিনি যখন তার বন্ধু বান্ধবদের মাঝে থাকতেন, তখন অন্যদের নকল করে মজা পেতেন।
চোখে গুরুতর আঘাত
সোভিয়েত সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সময়, ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে এক চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন তিনি।
বেটি ডাম তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, সোভিয়েত সৈন্যরা তাদের ওপর হামলা করবে এই আশঙ্কায় মোল্লা ওমর ও তার সঙ্গীরা লুকিয়ে ছিলেন। তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এমন সময় সোভিয়েত বিমান বাহিনী একটা বোমা ফেলে। সেই বিস্ফোরণে নিকটবর্তী মসজিদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত সেই ভবনের ধ্বংসাবশেষের একটা টুকরো হাওয়ায় উড়ে এসে মোল্লা ওমরের ডান চোখে আঘাত করে। ওই জায়গায় চিকিৎসকের এসে পৌঁছাতে পুরো একটা দিন সময় লেগেছিল।
ডাম লিখেছেন, সিআইএ তালেবানকে সাহায্য করছিল, তাদের অস্ত্রও পৌঁছে দিচ্ছিল। কিন্তু তারা মোল্লা ওমরের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করেনি।
যতক্ষণে চিকিৎসক মোল্লা ওমরের কাছে পৌঁছান, ততক্ষণে তিনি নিজের হাত দিয়ে তার চোখে ঢুকে থাকা ধাতব টুকরোটা তুলে ফেলেছিলেন। নিজের পাগড়ি দিয়ে চেপে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সহকর্মীরা মোল্লা ওমরকে পাকিস্তানের কোয়েটা শহরে নিয়ে যান।
ধর্ষক কমান্ডারকে ফাঁসি দিয়েছিলেন
মোল্লা ওমরের বিষয়ে একটা প্রচলিত গল্প আছে যা বেশ বিখ্যাত। ১৯৯৪ সালের গোড়ার দিকে স্থানীয় এক কমান্ডার দুইজন নারীকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে।
সাংবাদিক ও লেখক স্যান্ডি গল সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, মোল্লা ওমর ৩০ জন তরুণ ছাত্রকে একত্রিত করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন। এরপর তারা ওই অভিযুক্ত কমান্ডারের আস্তানায় আক্রমণ করেন।
তারা শুধু দু’জন মেয়েকে উদ্ধারই করেননি, ওই কমান্ডারকে ট্যাংকের ব্যারেলে ফাঁসিতে ঝোলায়। পরে তিনি (মোল্লা ওমর) বলেন, আমরা সেই মুসলমানদের বিরুদ্ধেও লড়াই করছি যারা পথ হারিয়ে ফেলেছে।
প্রসঙ্গত, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে আনুমানিক ৭৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার আফগানের মৃত্যু হয়েছে। এই যুদ্ধে ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্যেরও মৃত্যু হয়েছে।
দশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ আফগান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষ আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই চিরতরে হাত-পা হারিয়েছেন।
বিবিসির সাংবাদিক রহিমুল্লাহ ইউসুফজাই যখন কান্দাহারের গভর্নরের বাংলোয় মোল্লা ওমরের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন ওই সাংবাদিক দেখেন ঘাসের ওপর পাগড়ি পেতে দুপুরের ঘুম দিচ্ছেন ওমর।
মজার বিষয় হলো, বহু বিলাসবহুল কক্ষ এবং বলরুমযুক্ত ওই বিশাল ভবনে মোল্লা ওমর নিজের জন্য পছন্দ করেছিলেন সিঁড়ির নিচে একটা জানালাবিহীন ঘর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইএসআইয়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বেটি ডামকে বলেন, এখানে সব তালেবান নেতারা একসঙ্গে গালিচায় বসে চা পান করতেন। পাশেই একটা লোহার বাক্স রাখা থাকত যার মধ্যে সমস্ত টাকা-পয়সা রাখা হতো। কেউ কেউ এমনও জানিয়েছেন যে মোল্লা ওমর খুব কমই তার পোশাক পরিবর্তন করতেন কারণ তাকে সবসময় একই পোশাকে দেখা যেত।
তার খাদ্যাভ্যাসও ছিল একেবারে সাধারণ। স্যুপ ও সেদ্ধ আলু খেতেন তিনি। এই খাবার এত দ্রুত খেতেন যে দেখে মনে হতো তিনি খুবই ক্ষুধার্ত।
সাক্ষাৎকার দিতেন না
মোল্লা ওমর ভালো বক্তা ছিলেন না। তার কণ্ঠস্বর একজন বৃদ্ধ ও অশিক্ষিত মানুষের মতো শোনাত। একটা কথা কয়েকবার বলার অভ্যাস ছিল তার, যা শুনে মনে হতো তিনি তোতলাচ্ছেন।
১৯৯৫ সালে বিবিসির সিনিয়র সাংবাদিক রহিমুল্লাহ ইউসুফজাই মোল্লা ওমরের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিকের মধ্যে একজন যিনি এই শীর্ষ তালেবান নেতাকে কাছ থেকে দেখেছেন।
সে প্রসঙ্গে লেখক বেটি ডাম উল্লেখ করেছেন, মোল্লা ওমর ইউসুফজাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বাগত জানান। তিনি প্রায়ই বিবিসির পশতু সার্ভিসে তার (রহিমুল্লাহ ইউসুফজাইয়ের) অনুষ্ঠান শুনতেন।
কিন্তু সাক্ষাৎকার দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। তালেবান নেতা জানিয়েছিলেন, তিনি মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলতে পারবেন না। জীবনে একটাও সাক্ষাৎকার দেননি তিনি।
বেশ কয়েকবার বোঝানোর পর মোল্লা ওমর ইউসুফজাইকে বলেন, তিনি (রহিমুল্লাহ ইউসুফজাই) যেন নিজের প্রশ্নাবলী এবং টেপ রেকর্ডার তার (মোল্লা ওমরের) প্রেস উপদেষ্টা আবদুল রহমান হোতাকির কাছে রেখে যান। পরদিন মোল্লা ওমর সমস্ত প্রশ্নের জবাব রেকর্ড করান।
তার উত্তর শুনে মনে হচ্ছিল, যেন জবাব দিতে তার বেশ সমস্যা হয়েছে। আবদুল রহমান হোতাকি জানিয়েছিলেন যে, কিছু প্রশ্নের উত্তর তাকে একাধিকবার রেকর্ড করতে হয়েছে।
আসলে বিষয়টা হলো হোতাকি এক টুকরো কাগজে ওই প্রশ্নগুলো লিখে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা পড়তে বেগ পেতে হচ্ছিল মোল্লা ওমরকে।
লেখিকা ডাম জানিয়েছেন, ওই টেপ রেকর্ডারটা পরে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং কোনো সংরক্ষণাগারেই সেটা আর পাওয়া যায়নি।
গাড়ি চালানোর শখ
মোল্লা ওমরের গাড়ি চালানোর শখ ছিল, তবে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। বেশ কয়েকবার তিনি দুর্ঘটনার কবলেও পড়েছেন।
তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুতাসিম আগা জানের কথায়, আমরা চাইতাম না যে তিনি গাড়ি চালান। কিন্তু এতটাই নাছোড়বান্দা ছিলেন তিনি যে চালককে পাশে বসিয়ে রেখে নিজেই গাড়ি চালাতেন। অনেক সময় দুর্ঘটনার পর অপেক্ষা করতেন কখন গাড়িটা গ্যারাজ থেকে মেরামত হয়ে ফিরবে, যাতে তিনি আবার সেটি চালাতে পারেন। যুদ্ধ গতি হারালে অন্যান্য তালেবান যোদ্ধাদের মতো তিনি নিজেও লড়াইয়ে যোগ দিতেন।
লেখক আহমেদ রশিদ তার বই ‘দ্য স্টোরি অফ আফগান ওয়ারলর্ডস’-এ লিখেছেন, মোল্লাহ ওমর পারলে সবসময় বাংকারে তালেবান যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লড়াই করতেন, কিন্তু তার কমান্ডাররা সেটা চাননি। তারা তাকে বলতেন- তোমাকে আমাদের নেতা হিসেবে প্রয়োজন, সৈনিক হিসেবে নয়।
আধুনিক জীবন থেকে বহু দূরে
তালেবানরা যখন প্রথম কাবুলে প্রবেশ করে, তখন মোল্লা ওমর কাবুলের পরিবর্তে কান্দাহারে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাবুলের দৈনন্দিন শাসনের দায়িত্ব মোল্লা রব্বানির কাছে হস্তান্তর করেন। মোল্লা রব্বানি প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন, যেখানে আগে বুরহানউদ্দিন রব্বানি থাকতেন।
তালেবানদের প্রশাসনিক বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না এবং তাদের মধ্যে অনেকেই খুব অল্প বয়সী ছিলেন। মোল্লা জাইফ তার বই ‘মাই লাইফ উইথ দ্য তালেবান’-এ লিখেছেন, এদের অনেকেই শুধুমাত্র কুরআন পড়তে এবং যুদ্ধ করতে জানতেন। খুব কষ্ট করে কোনোমতে মতে সই করতে পারতেন। তারা কক্ষের চেয়ারগুলো সরিয়ে রেখে মেঝেতে তোশক পেতে মন্ত্রীদের বৈঠকের আয়োজন করতেন যা দেখে অন্যান্য কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে যান।
তালেবানের শীর্ষ নেতারা গাড়ির বদলে পায়ে হেঁটে কাবুল শহরে যেতেন। সম্ভবত এর একটা কারণ হলো - সেই সময় কাবুলে খুব কম গাড়ি ছিল এবং পেট্রোলের দামও ছিল আকাশচুম্বী। পাসপোর্টের ছবি ছাড়া সারা দেশে ছবি তোলা নিষিদ্ধ ছিল।
গান শোনা এবং বাজানো দুই-ই নিষিদ্ধ ছিল। বহু গাড়ি থামিয়ে তার ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে ক্যাসেট সরিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। জাতীয় খেলা ‘বুজকুশি’ও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি দাবা খেলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফুটবল খেলার সময় হাফ প্যান্টের পরিবর্তে ফুল প্যান্ট পরতে হতো।
মোল্লা ওমর এবং লাদেনের বন্ধুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ১৯৯৬ সালে সুদান যখন ওসামা বিন লাদেনকে সেই দেশ ছাড়তে বলে, তখন আফগানিস্তানে চলে যাওয়া ছাড়া তার কাছে আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। মোল্লা ওমর তাকে সে সময় আশ্রয় দেন বলেই শোনা যায়। যদিও ওসামা বিন লাদেনের পুত্র অন্য কথা দাবি করেছেন।
ওসামা বিন লাদেনের ছেলে ওমর বিন লাদেন তার বই ‘গ্রোয়িং আপ বিন লাদেন’ - এ লিখেছেন, আফগানিস্তান যাওয়ার পথে আমাদের বিমান যখন সৌদি আরবের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন বাবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। ভয় ছিল যে আমাদের বিমানকে রকেট দিয়ে আঘাত করে ধ্বংস না করে দেওয়া হয়।
তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেনের বিমান যখন জালালাবাদে অবতরণ করে, তখন তাকে স্বাগত জানানোর জন্য মোল্লা ওমর উপস্থিত ছিলেন না।
বাবা ওসামা বিন লাদেন এবং মোল্লা ওমরের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন পুত্র ওমর বিন লাদেন। তার দাবি, মোল্লা ওমরের আহ্বানে তার বাবা আফগানিস্তান যাননি।
তিনি লিখেছেন, এটা খুবই ভুল ধারণা যে মোল্লা ওমরের আমন্ত্রণে ওসামা আফগানিস্তানে এসেছিলেন। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের লোকজন।
প্রাথমিকভাবে আফগান সম্রাট জাহির শাহের এক প্রাসাদে তাকে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর ওসামা তোরা-বোরা পাহাড়ের একটা গুহায় বাস করতে যান। এই ‘কথিত’ বন্ধুত্বের (মোল্লা ওমর এবং ওসামা বিন লাদেনের) কোনো স্মৃতি আমার নেই।
৯/১১ হামলার পর
ওমর বিন লাদেন জানিয়েছেন, তার স্পষ্ট মনে আছে ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর মোল্লা ওমর ওসামা বিন লাদেনকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন।
লেখক বেটি ডামকে ওমর বিন লাদেন বলেছিলেন, মোল্লা ওমর আমার বাবার চেয়েও লম্বা ছিলেন। তিনি যখন আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন মোল্লা ওমরের জন্য ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ওসামা থেকে কিছুটা দূরে বসেন। নিজের জন্য একটা চেয়ার চেয়েছিলেন, যা কিছুটা অদ্ভুত ছিল, কারণ অন্য সবাই মেঝেতে বসেছিল। তিনি আমার বাবাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন - কাজ হচ্ছে না। আপনাকে এখান থেকে বের হতে হবে।
ওসামাকে মোল্লা ওমর বলেছিলেন, ওরা (আমেরিকানরা) ইতোমধ্যে মাদক ও নারী অধিকারকে বড় ইস্যুতে পরিণত করেছে। আমি চাই না আপনার প্রত্যর্পণ আরও একটা বড় ইস্যু হয়ে উঠুক।
ওমর বিন লাদেন লেখক বেটি ডামকে বলেছিলেন, মোল্লা ওমর বলেন ইসলামি আইন অনুযায়ী আমি আপনাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারব না। তবে আমি আশা করব আপনি নিজেই চলে যাবেন।
তিনি লিখেন, এর উত্তরে আমার বাবা যখন ওমরকে বলেন যে সুদান তাকে পাঁচ বছর থাকার অনুমতি দিয়েছিল, আর আফগানিস্তানে তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর বাস করেছেন, তখন তিনি (মোল্লা ওমর) উঠে দাঁড়ান এবং চলে যান। এমনকি তিনি ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে করমর্দনও করেনি।
৯/১১ হামলার পরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানকে বলেছিল ওসামা বিন লাদেনকে যেন তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মোল্লা ওমরের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি তারা। এরপর যুক্তরাষ্ট্র তোরা-বোরাতে বোমা হামলা শুরু করে দেয়।
বামিয়ানে বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস
২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মোল্লা ওমর বামিয়ানে দু’টো ঐতিহাসিক বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন।
এই মূর্তিগুলো ১৭৪ থেকে ১১৫ ফুট উঁচু ছিল। ১৫০০ বছর আগে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছিল ওই মূর্তি যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার ওই ঘোষণায় সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে, মোল্লা ওমর নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি।
২০০১ সালের দোসরা মার্চ বিস্ফোরক দিয়ে ওই ঐতিহ্যবাহী মূর্তিগুলো ধ্বংস করেন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
মোল্লা ওমরকে হত্যার চেষ্টা
কান্দাহারে ২০০১ সালের ছয়ই অক্টোবরের রাতে মোল্লা ওমরের দপ্তরের ওপরে একটা মার্কিন চালকবিহীন প্রিডেটর ৩০৩৪ ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, তাকে হত্যা করা।
‘দ্য আটলান্টিক’ ম্যাগাজিনের ২০১৫ সালের ৩০ মে-র সংখ্যায় ‘দ্য স্টোরি অফ আমেরিকাস ফার্স্ট ড্রোন স্ট্রাইক’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে ক্রিস উড লিখেছেন, হাজার হাজার মাইল দূরে ল্যাংলিতে সিআইএ-র সদর দপ্তর সিআইএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ড্রোনের ছবি দেখছিলেন।
তাদের আশঙ্কা ছিল যে দপ্তরে ওই বোমাটা ফেলা হলে অনেক নিরীহ মানুষের মৃত্যু হবে। তাই তারা মোল্লা ওমরের বাইরে বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করছিলেন।
ক্রিস উড লিখেছেন, যখন সশস্ত্র ব্যক্তি বোঝাই তিনটে ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি ওই ভবন থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সিআইএ কর্মকর্তারা নিশ্চিত ছিলেন যে ওই গাড়ির মধ্যে একটাতে মোল্লা ওমর রয়েছেন। কিন্তু তাদের হামলার টাইমিং নিয়ে দু’জন জেনারেলের মধ্যে মতপার্থক্যের ফলে হেলফায়ার রকেট নিক্ষেপ করা হয়নি। ভিড়ে ঠাঁসা রাস্তায় ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় ওই তিনটে ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি।
দীর্ঘ রোগভোগের পর মৃত্যু
এই তালেবান প্রধানকে ঘিরে দীর্ঘকাল রহস্য ছিল। আজও মোল্লা ওমরের মৃত্যু নিয়ে নানান ধরনের কথা প্রচলিত আছে।
২০১৫ সালের জুলাই মাসে আফগান সরকার ঘোষণা করে যে তার মৃত্যু হয়েছে। যদিও অনেকে বলেন, এর দুই বছর আগে ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
লেখক বেটি ডাম লিখেছেন, মোল্লা ওমরের সহযোগী আবদুল জব্বার ওমারি আমাকে বলেছিলেন যে, সেদিন কান্দাহারে প্রচুর শিলাবৃষ্টি হয়েছিল। মোল্লা ওমরের তিন মাস ধরে কাশি হচ্ছিল। তিনি বমিও করছিলেন। ওমারি তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু মোল্লা ওমর তার কথা শোনেননি।
ওমারি তাকে বলেছেন, অনেক কষ্টে তিনি স্থানীয় একটা দোকান থেকে কেনা ইনজেকশন নিতে রাজি হন। তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তাকে যখন আমি স্পর্শ করি তখন নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যান তিনি। পরদিন তার মৃত্যু হয়।
Read_more
মন্তব্য / প্রেরক
রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার দাবি। সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্কবার্তা
-
আন্তার্জাতিক ডেস্ক : সম্পাদনা: মেf: রফিকুল ইসলাম সরকার
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন। সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে।
হুথিদের দাবি অনুযায়ী, হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একইসঙ্গে সৌদি আরবের রাবিঘ এলাকায় আরামকোর একটি স্থাপনা, দক্ষিণাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইত এলাকার সামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
বিমান চলাচলে বিঘ্নের দাবি
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেছেন, রিয়াদ বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলার ফলে বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। সোমবার রাতে রিয়াদের আকাশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন এএফপির সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎসের তথ্যেও কয়েকটি ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন বা বিলম্বের কথা উঠে এসেছে। তবে বিমানবন্দরে হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বা পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বন্ধের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সৌদি আকাশসীমা নিয়ে হুথিদের সতর্কবার্তা
হামলার আগে হুথিরা সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকেও সতর্ক করে। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে বলা হয়, মক্কা ও মদিনার পবিত্র আকাশসীমা বাদে সৌদি আরবের বাকি আকাশসীমাকে তারা সম্ভাব্য হামলার আওতায় বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সৌদির কঠোর প্রতিক্রিয়া
হুথিদের হামলার দাবির পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানায়। সরকারি বিবৃতিতে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এলাকায় সৌদি নৌযান লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে সৌদি সরকার দেশের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, সম্পদ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সৌদি সরকারের এই অবস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে তীব্র হয়েছে। ৫ অক্টোবর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। এর পরই সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি সামনে আসে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা
রিয়াদে হামলার দাবি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। সৌদি আরবের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘও ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রিয়াদ মিশন ৫ অক্টোবর সৌদি আরবে সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি নিয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি: হুথিরা রিয়াদ বিমানবন্দরসহ একাধিক সৌদি স্থাপনায় হামলার দাবি করলেও বিমানবন্দরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। তবে রিয়াদের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং সম্ভাব্য বিমান চলাচল বিঘ্নের তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে সৌদি-ইয়েমেন সংঘাতের নতুন এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মন্তব্য / প্রেরক
জাতিসংঘ ‘অকার্যকর সংস্থা’, এর কর্মকর্তারা ‘অহংকারী পরজীবী’: আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট
-
আন্তর্জাতিক ডেস্ক |
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তীব্র ভাষায় জাতিসংঘের সমালোচনা করেছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। তিনি জাতিসংঘকে একটি ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ভাষণে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলা দেশগুলো কোনো ন্যায্যতা বা পুরস্কার পাচ্ছে না, অন্যদিকে যারা নিয়ম ভঙ্গ করছে তাদেরও কোনো জবাবদিহিতা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিশ্বসংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর পরিবর্তে সেখানে বিশৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টিনার কাছে যা ‘লাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত) নিয়ে যুক্তরাজ্যের সাথে দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্ব বিরোধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি এবং চোখ বন্ধ করে রয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাভিয়ের মিলেই। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান যে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে না থেকে আর্জেন্টিনা নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় নিজেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মন্তব্য / প্রেরক
দিনটি ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। বুলডোজার দিয়ে মাটি সরানোর কাজ করছিলেন এক খনি শ্রমিক। হঠাৎ মাটির নিচে চোখে পড়ে চকচকে একটি বস্তু। প্রথম দেখায় পাথর মনে হলেও কাছে যেতেই বোঝা যায়—এটি কোনো সাধারণ পাথর নয়, বিশাল এক প্রাকৃতিক সোনার পিণ্ড!
ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের রুবি শহরের কাছে সুইফট ক্রিক এলাকায়। খনি শ্রমিক ব্যারি ক্লে মাটি কাটার সময় আবিষ্কার করেন প্রায় ৯ দশমিক ১৪ কেজি ওজনের বিশাল ওই সোনার পিণ্ড। পরবর্তী সময়ে এটি পরিচিতি পায় ‘আলাস্কা সেন্টেনিয়াল নাগেট’ নামে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পিণ্ডটির ওজন ছিল ২৯৪ দশমিক ১০ ট্রয় আউন্স—অর্থাৎ ২০ পাউন্ডের কিছু বেশি। আকারে এটি প্রায় একটি শিশুর মাথার সমান। আবিষ্কারের পর এটি আলাস্কায় পাওয়া সবচেয়ে বড় অক্ষত প্রাকৃতিক সোনার পিণ্ড হিসেবে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নামকরণে রয়েছে ইতিহাস
আলাস্কার বিখ্যাত ক্লনডাইক সোনার সন্ধানের শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণ করে পিণ্ডটির নাম দেওয়া হয় ‘আলাস্কা সেন্টেনিয়াল নাগেট’। বিশাল আকৃতি, প্রাকৃতিক অবস্থার অক্ষুণ্নতা এবং বিরলতার কারণে এটি দ্রুতই খনি ও সোনার ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেয়।
তৎকালীন হিসাবে, পশ্চিম গোলার্ধে আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক সোনার পিণ্ডগুলোর মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর চেয়ে বড় ‘বুট অব কর্টেজ’ নামের একটি সোনার পিণ্ড ১৯৮৯ সালে মেক্সিকোতে পাওয়া যায়, যার ওজন ছিল প্রায় ২৪ পাউন্ড।
দীর্ঘদিন ব্যক্তিগত মালিকানায়
অবিশ্বাস্য এই আবিষ্কারের পরপরই ব্যারি ক্লে পিণ্ডটি বিক্রি করে দেননি। দুই দশকেরও বেশি সময় এটি ব্যক্তিগত মালিকানায় ছিল।
পরে ২০২১ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ক্লের কাছ থেকে পিণ্ডটি সংগ্রহ করেন এক বিক্রেতা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অবস্থিত হেরিটেজ নিলাম প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি নিলামে তোলা হয়।
অনলাইন নিলামে এক সংগ্রাহক ৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে ‘আলাস্কা সেন্টেনিয়াল নাগেট’ কিনে নেন।
শুধু সোনার দামেই নয়, বিরলতাতেও মূল্যবান
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আকারের এবং তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় থাকা প্রাকৃতিক সোনার পিণ্ড অত্যন্ত বিরল। ফলে এর মূল্য কেবল এতে থাকা সোনার বাজারদর দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিরলতার কারণেও সংগ্রাহকদের কাছে এর বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।
হেরিটেজ নিলামের পক্ষ থেকেও নিলামের আগে জানানো হয়েছিল, ‘আলাস্কা সেন্টেনিয়াল নাগেট’ আলাস্কায় আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় সোনার পিণ্ড।
একজন খনি শ্রমিকের সাধারণ কর্মদিবসে বুলডোজারের নিচে হঠাৎ পাওয়া সেই চকচকে বস্তুটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে আলাস্কার খনি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আবিষ্কার। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা সেই সোনার পিণ্ড শুধু ব্যারি ক্লের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং স্বর্ণ অনুসন্ধানের ইতিহাসে যোগ করেছে এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য / প্রেরক
সুইডেনের নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে এগিয়ে বামঘেঁষা জোট, ফিরতে পারেন ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসন ১৭৬ আসন পেয়েছে চারদলীয় বিরোধী জোট, ক্রিস্টারসনের জোটের আসন ১৭৩; পদত্যাগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
-
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সম্পাদনায় : মোঃ রফিকুল ইসলাম সরকার, সম্পাদক, ঢাকামোড়২৪.কম
সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে এগিয়ে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-বামপন্থী বিরোধী জোট। চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষে চারদলীয় বিরোধী জোট ৩৪৯ আসনের রিক্সড্যাগে পেয়েছে ১৭৬টি আসন। বিপরীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন ডানঘেঁষা জোট পেয়েছে ১৭৩টি আসন।
ফলাফল প্রকাশের পরই প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি পার্লামেন্টের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানান।
অল্প ব্যবধানে পাল্টে গেল ক্ষমতার সমীকরণ
সুইডেনের ২০২৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দুই শিবিরের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত কম। ৩৪৯ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বাধীন জোট।
সুইডিশ নির্বাচন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট পেয়েছে ১৭৬ আসন এবং ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন সরকারপন্থী চার দলের জোট পেয়েছে ১৭৩ আসন। বিদেশ থেকে আসা ভোটসহ বাকি ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর এই ব্যবধান নিশ্চিত হয়।
তবে আসনসংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও নতুন সরকার গঠন অ্যান্ডারসনের জন্য সরল হবে না। তাঁর সম্ভাব্য মিত্র দলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আসন সোশাল ডেমোক্র্যাটদের
নির্বাচনে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসনের সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দলটি পেয়েছে ৯৯টি আসন। তবে আগের পার্লামেন্টের তুলনায় দলটির আসন কমেছে আটটি।
অ্যান্ডারসন ২০২১ সালে সুইডেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর তিনি ক্ষমতা হারান। এবারের নির্বাচনী ফল তাঁকে আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে।
ফলাফল ঘোষণার পর অ্যান্ডারসন বলেন, সুইডিশ জনগণ দেশের জন্য নতুন দিক বেছে নিয়েছে এবং বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
সরকার গঠনেই বড় পরীক্ষা অ্যান্ডারসনের
অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে সোশাল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি, লেফট পার্টি ও সেন্টার পার্টি। চার দলের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। বিশেষ করে সেন্টার পার্টি ও লেফট পার্টির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।
সেন্টার পার্টি জানিয়েছে, তারা এমন কোনো সরকারে যোগ দিতে চায় না যেখানে লেফট পার্টিও সরাসরি অংশীদার থাকবে। ফলে অ্যান্ডারসনকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সমঝোতার কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।
রাজনৈতিকভাবে একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে—লেফট পার্টিকে মন্ত্রিসভার বাইরে রেখে পার্লামেন্টে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করা। তবে এই সমীকরণ চূড়ান্ত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
ক্রিস্টারসনের জোটে বড় ধাক্কা
উলফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২২ সাল থেকে তিনদলীয় মধ্য-ডান জোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় ছিল। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে তাদের বাইরে থেকে সুইডেন ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
এবার সেই সমীকরণেও পরিবর্তন এসেছে। সুইডেন ডেমোক্র্যাটরা ৬২টি আসন পেয়েছে—আগের তুলনায় ১১টি কম। দলটি এবার ক্রিস্টারসনের সম্ভাব্য নতুন সরকারে মন্ত্রিসভায় সরাসরি অংশ নেওয়ার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনী ফল সেই পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে।
এখন কী হবে?
সুইডেনের সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। স্পিকার প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী মনোনয়ন করবেন এবং রিক্সড্যাগে সেই প্রার্থীর বিষয়ে ভোট হবে।
অ্যান্ডারসন এখন সরকার গঠনের জন্য সম্ভাব্য মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে পারেন, অথবা কিছু দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনার চেষ্টা করতে পারেন।
তবে কোনো প্রার্থীকে চারবার প্রত্যাখ্যান করা হলে সুইডেনের নিয়ম অনুযায়ী নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অভিবাসন ও অপরাধনীতি নিয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অভিবাসন ও অপরাধনীতি। ক্রিস্টারসনের সরকার গত চার বছরে অভিবাসন ও অপরাধ দমনে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এসব নীতির কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা বলেছে এবং কল্যাণব্যবস্থা, পরিবেশ ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে সুইডেনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির বেশ কিছু বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে বিস্তর ঐকমত্য রয়েছে। ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং ন্যাটোর সদস্যপদ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সুইডেন ২০২৪ সালে ন্যাটোর ৩২তম সদস্য হয়।
ইউরোপীয় রাজনীতিতেও নজর সুইডেনের দিকে
সুইডেনের নির্বাচনের ফল ইউরোপীয় রাজনীতিতেও বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী দলগুলোর প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। সুইডেনে এবার সেই প্রবণতার বিপরীতে মধ্য-বামপন্থী জোট অল্প ব্যবধানে এগিয়ে এসেছে।
তবে মাত্র তিন আসনের ব্যবধানে পাওয়া এই ফলকে সরাসরি একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। নতুন সরকার কীভাবে গঠিত হবে এবং কোন দলগুলো মন্ত্রিসভায় থাকবে—তার ওপরই আগামী দিনের রাজনৈতিক দিক অনেকটা নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন স্টকহোমে
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সুইডেনে শুরু হয়েছে সরকার গঠনের আলোচনা। ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরতে পারবেন কি না, তা এখন নির্ভর করছে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা এবং পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করার ওপর।
অন্যদিকে ক্রিস্টারসনের পদত্যাগের পর তাঁর জোটও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা করবে। ফলে নির্বাচনে ১৭৬–১৭৩ আসনের ফলাফল প্রকাশ হলেও সুইডেনের পরবর্তী সরকার কেমন হবে, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো বাকি।
তথ্য : ইন্টারনেট
মন্তব্য / প্রেরক
সাম্প্রতিক
নিউজলেটার
নিউজলেটার বিবরণ